মধ্যরাতে অক্সিজেন–সংকট,দুই রোগীর মৃত্যুতে ক্ষোভ

গভীর রাতে রোগীর স্বজনদের আকস্মিক জানানো হয়, হাসপাতালে অক্সিজেনসংকট দেখা দিয়েছে। আইসিইউতে থাকা রোগীদের দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে। নিরুপায় স্বজনেরা অন্য হাসপাতালে নিয়ে ব্যবস্থা করতে করতেই দুজন রোগী মারা যান। এর মধ্য একজন মারা যান পথে। এ মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটেছে সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। সময়মতো অক্সিজেন এসে না পৌঁছানোর কারণে এমন হয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

ঘটনাটি ঘটে নগরের সোবহানীঘাট এলাকার সিলেট কমিউনিটি বেইজড হাসপাতালে গত শুক্রবার ভোররাতে। সেই রাতে হাসপাতালে ৫৪ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে ১৯ জন ছিলেন আইসিইউতে।

রোগীর স্বজনেরা জানান, শুক্রবার রাত আড়াইটার দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অক্সিজেন–সংকটের বিষয় জানিয়ে রোগীদের নিজ নিজ জিম্মায় অন্য হাসপাতালে যেতে বলেন। এ সময় ওই হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ) ও কেবিনে করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে ১৩ জন রোগী ছিলেন। তাঁদের অন্যত্র নেওয়ার চেষ্টার সময় ভোররাতে একজন মারা যান। আরেকজন মারা যান গতকাল শনিবার বিকেলে অন্য হাসপাতালে।

ওই রাতে অন্য কোনো হাসপাতালে আইসিইউর ব্যবস্থা করতে না পারায় মারা যান কাঞ্চন বিবি (৪৫)। তাঁর মেয়ে পান্না বেগম বলেন, ‘রাত দুইটার দিকে হঠাৎ অক্সিজেন–সংকটের বিষয়টি জানানো হয়। সে সময় কোনো উপায় না পেয়ে মাকে নিয়ে একাধিক হাসপাতালে ঘুরে আইসিইউ কিংবা অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে পারিনি। বাধ্য হয়ে ওই হাসপাতালেই ফেরত আনার পথে মা মারা যান।’ তিনি বলেন, হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার কারণেই তাঁর মা মারা গেছেন।

বেসরকারি ওই হাসপাতালটি থেকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর শনিবার বিকেলে মারা গেছেন কাশিয়ারা বেগম। তাঁর ছেলে মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাত আড়াইটার দিকে ওই হাসপাতাল থেকে হঠাৎই অক্সিজেন–সংকটের কথা বলে আমাদের বের করে দেওয়া হয়। ভোররাতের একটু আগে মাকে এই হাসপাতালে স্থানান্তর করতে পারি। প্রয়োজনের সময় অক্সিজেন না পাওয়ায় আমার মা মারা যান।’

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈন উদ্দিনের মা স্বপ্না বেগমও (৭০) ওই রাতে বেসরকারি হাসপাতালটিতে ভর্তি ছিলেন। কিন্তু ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গেলেও তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক। ৯ জুলাই ওই হাসপাতালে যখন তিনি ভর্তি হন, হাসপাতালের আইসিইউ রোগীতে পরিপূর্ণ ছিল। স্বপ্না বেগমের হাই ফ্লো অক্সিজেন প্রয়োজন হচ্ছিল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে হাসপাতালে অক্সিজেনের মাত্রা কমতে থাকে। সে সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁরা ‘ঠিক হয়ে যাবে’ বলে জানান। রাত দুইটার দিকে তাঁরা জানান, অক্সিজেন–সংকট দেখা দিয়েছে। স্বজনেরা যাতে নিজেদের জিম্মায় রোগীদের অন্য হাসপাতালে দ্রুত স্থানান্তর করেন।

মঈন উদ্দিন বলেন, নিরুপায় হয়ে রাত আড়াইটায় বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে একটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে তিনি ওসমানী হাসপাতালে তাঁর মাকে নিয়ে যান। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানেও আইসিইউ শয্যা পাননি। তিনি বলেন, ‘এখন মায়ের অবস্থা অনেকটা সংকটাপন্ন। হাসপাতালের অক্সিজেন দিয়ে তাঁর হচ্ছে না। আলাদা সিলিন্ডার কিনে অক্সিজেন দিচ্ছি।’

জানতে চাইলে সিলেট কমিউনিটি বেইজড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তারেক আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রায় এক সপ্তাহ ধরে অক্সিজেনের সংকট ছিল। আমরা রোগীদের যথাসাধ্য সেবা দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। রোগীর স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়ে যাওয়ার ভয়ে বিষয়টি আগে জানাইনি। যাঁরা অক্সিজেন সরবরাহ করছিলেন, তাঁরা আমাদের জানিয়েছিলেন, বৃহস্পতিবার রাতেই অক্সিজেন নিয়ে সিলেট পৌঁছাবেন। কিন্তু রাতে মহাসড়কে যানজটে আটকে যাওয়ায় সেটি সম্ভব হয়নি। পরে রাত ১২টায় আমরা রোগীর স্বজনদের অক্সিজেন–সংকটের বিষয়টি জানাতে বাধ্য হই। আমরা তাঁদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের জন্য বলি। এতে হাসপাতালের আইসিইউয়ে থাকা ১১ জন ও কেবিন থেকে দুজন চলে যান। পরে শুক্রবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে অক্সিজেন নিয়ে আসার পর অক্সিজেন সরবরাহ স্বাভাবিক হয়।’

জানতে চাইলে সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন জন্মেজয় দত্ত প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘটনা আমরা শুনেছি। ভুক্তভোগী কেউ আমাদের কাছে এখনো অভিযোগ করেননি। আমরা বিষয়টি বিস্তারিত খবর নিয়ে করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেব।’

source- prothom alo

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *