বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক নক্ষত্রের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ!!

২০০৭ সালের ১৬ই মার্চ, খুলনার রাস্তা ধরে সাঁই সাঁই করে ছুটে চলেছে দুটো মোটর বাইক, গন্তব্য খাসির মাংসের জন্য বিখ্যাত আব্বাস হোটেল। বাইকের আরোহী চার ক্রিকেটার। সেলিম-সেতু এক বাইকে, আর রানা- শাওন অন্য বাইকে। সেতুর খুনসুটিতে বিরক্ত রানা নিজের বাইকে সেতুকে বদল করে নিলেন। আহা, নিয়তি! সেলিম-শাওনের বাইক তখন বেশ কিছুটা সামনে চলে গিয়েছে, কিন্তু দেখা নেই রানাদের বাইকের। ইউ টার্ন নিয়ে পেছনে ফিরে এলেন শাওনরা, কিন্তু সদা হাসিমাখা দুটি মুখ তখন রাস্তার পাশে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে। মাইক্রোবাসটা জানলোও না বাংলাদেশ ক্রিকেটের দুটি নক্ষত্রকে এইমাত্র সে মাংসের স্তূপ বানিয়ে চলে গেলো।

মাঝে মাঝে রাতের কালো আকাশে তারাদের ভিড়ে রানাদের খুঁজি। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখের পাতা কেঁপে যায়, কখনো কখনো খসে পড়তে দেখি কোন তারাকে, ঠিক যেমন আমাদের ক্রিকেট থেকে খসে পড়েছিল দুটি নক্ষত্র! বড্ড অবেলায় চলে গেলে তোমরা, বড্ড বেশি অবেলায়।

আজ বাংলাদেশের ক্রিকেটে অজস্র তারকার ভিড়ে তুমি বিস্মৃত। অভিমান হয় বুঝি? নাকি মুচকি হাসির আড়ালে চোখের কোনে চিক চিক করতে থাকা ধারাটাকে আটকে রাখো! মাকে বড্ড মিস করো বুঝি, নাকি ক্রিকেটকে? কেন চলে গেলে, তোমাদের তো যাবার কথা ছিল না! আজ তো তোমার প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙ্গে বেড়িয়ে যাওয়া সেই আর্ম বলে আনন্দে ভাসানোর কথা আমাদের। কিন্তু হায়, আমাদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে তুমি দিব্যি উপরে বসে মজা দেখছ!

জানো, তোমার ৩৫ নম্বর সবুজ টেস্ট ক্যাপটা এখনো তেমনি আছে। ৯৬ নম্বর জার্সিটাতেও আঁচর লাগেনি একটুও। শুধু তুমি নেই বলে ধুলো জমে যায় ট্রফিগুলোয়। দর্শনার্থীরা আসে, তাদের কারো হাতের ছাপ হয়ত ধুলোর উপরে পড়ে থাকে আনমনে। শোকেসে ওগুলোর আর্তনাদ হয়ত তোমার কান অবধি পৌছায় না! সাজানো স্মৃতিগুলো এখন শুধুই মায়ের চাপা কান্নার সাক্ষী হয়ে থাকে। তবুও তুমি ফিরবে না জানি, ওই লাল সবুজ জার্সি গায়ে তোমায় দেখা যাবে শুধু সেলুলয়েডের ফিতায়।

কাছের বন্ধুরা সেদিন সবাই ক্যারিবীয় দ্বীপে, সেখানে জায়গা হয়নি তোমার। তুমি রয়ে গেলে বিসিবি চ্যালেঞ্জ কাপ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট খেলতে। ম্যাচে অপরাজিত তুমিই পরাজিত হয়ে গেলে নিয়তির নির্মমতায়। জীবনের শেষ ম্যাচে তোমাকে কেউ আউট করতে পারেনি, তাহলে নিয়তির কাছে কেন তোমার এই পরাজয়! সেই খুলনা স্টেডিয়ামের ঘাসগুলো আজ অযত্নে অবহেলায় বড় হয়ে উঠেছে, অবহেলা তো তোমার সাথেও করা হয়েছিল। ডেভের প্রিয় ছাত্রের একজন হয়েও বিশ্বকাপের টিকিট তোমার পকেটে আসেনি। খুব কি খারাপ করেছিলে ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচে? বাংলাদেশকে এনে দেওয়া প্রতিটি জয়ে তোমার অবদান কি করে ভুলি রানা?

বন্ধু ম্যাশকে খুব মিস করো তাই না? একই রুমে কাটানো রাত গুলোর স্মৃতি ভেবেই বুঝি তোমার সময় কাটে? ম্যাশ এখনো রাতে লাইট জ্বালিয়ে ঘুমায় কিনা সেটা দেখতে ইচ্ছা করে না? নাকি চুপিচুপি এসে ঠিকই দেখে যাও প্রিয় বন্ধুকে। অথচ এখনও একসাথে পাড়ি দেবার বাকী ছিল অনেকটা পথ, প্রিয় সেই বন্ধু তোমাকে মনে করে এখনো চোখের জল ফেলে।

তোমার নামে স্টেডিয়ামে একটি স্ট্যান্ডের নামকরন হয়েছে জানো? তোমার চলে যাবার দিনকে স্মরণ করে হাজারো গল্পের ভিড় জমে নীল সাদার দুনিয়ায়। জানি এগুলোর কোন মূল্য নেই ওপারের দুনিয়ায়, কিন্তু এপারে রেখে যাওয়া মানুষগুলোর মন যে মানে না। সব থেকে কম বয়সী টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে চলে যাবার রেকর্ড কেন তোমাকেই করতে হবে? এত লোভী কেন তুমি বলতো?

জানি, আজকের খেলায় গ্যালারীর কোন একটি অংশে তুমি থাকবে। যতই অভিমানের মুখোশ পড়ে থাকো, ওই লাল সবুজের টানে তোমাকে আসতেই হবে বারবার। প্রিয় বন্ধুর কলার উঁচু করে দৌড়ানো রান আপ দেখতে অথবা তোমার জায়গা নেওয়া ওই বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের নৈপুণ্য দেখতে, অথবা বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলে গর্জন তোলা গ্যালারীর টানে তুমি ছুটে আসবে দুর আকাশের তারাদের মাঝ থেকে। সেলুলয়েডের ফিতায় হোক অথবা হৃদয়ের গভীরতম স্থানে, তোমরা আজীবন রয়ে যাবে সত্যিকারের তারা হয়ে। বাংলাদেশের প্রতিটা খেলায় ওই দূর রাতের আকাশের দিকে আমরা তাকিয়ে থাকব কোন খসে পড়া তারার অপেক্ষায়। ভেবে নেব, তোমরা আসছো…

[বাংলাদেশ দলের সাবেক ক্রিকেটার মানজারুল ইসলাম রানার ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী! রানা ২০০৭ সালে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচের আগে খুলনায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন] ©Tonmoy Bose

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *