সাজ্জাদ হোসেন ক্ষুদ্রের উপন্যাস “ঘুণে খাওয়া পাণ্ডুলিপি”- ২য় পর্ব

সাফিনা বেগম খান, এই ক্যাম্পাসের সবচাইতে পরিচিত মুখ। মোরশেদ ভাইয়ের প্রেমিকা। হয়তো ভাবছেন নেতার প্রেমিকা, সাহস বেশি থাকবে এবং ছেলে মেয়ে সবাই ভয় পাবে এমনটাই স্বাভাবিক। সম্পূর্ণ ভুল ভাবছেন। ছাত্র নেতার প্রেমিকা হবার কোনো ধরণের সুযোগ আজ পর্যন্ত সে নেয়নি। পরিচিত মুখ হবার পেছনে মোরশেদ ভাইয়ের কোনো রকম হাত নেই। এই সাফিনা বেগম খান নামটার পেছনে রয়েছে একজন বোর্ড টপার, ভর্তি পরীক্ষা টপার, ডিপার্টমেন্ট টপার এর টাইটেল। একের পর এক সফলতা তার কদম ছুঁয়েছে। আর আজকে সবাই তাকে চেনে তার নিজ ক্ষমতায়।

সাফিনা বেগম খানের অন্য একটা পরিচয়ও রয়েছে যা শুধু মাত্র একটা মানুষ ছাড়া আর কেউ জানে না। খোদ মোরশেদ ভাইও জানে না। জানার সুযোগ কই? সারাদিন পার্টির মিটিং আর দল নিয়ে পড়ে থাকলে এতো কিছু খেয়াল করা যায়? ক্লাস যে তার কোন চাঙ্গে উঠেছে তা সে নিজেও জানে না। সেকেন্ড ইয়ারের পর থেকে তো ক্যাম্পাসের লাইব্রেরীর রাস্তাও সে ভুলে গেছে হয়তো। সকাল থেকে দিবার সাথে দেখা হয়নি। হলে পড়ে থাকলে দেখা হবেও বা কি করে? এর মধ্যে দুইবার ফোনে কথা হয়েছে। নোভা আর জিহাদের সাথে লাইব্রেরীতে আজমল স্যারের নোটস বানাচ্ছে। ডিপার্টম্যান্টে নাকি তুমুল ঝগড়া হয়েছে। শুরুটা নিশ্চয় শফিক করেছে। কারন আজ পর্যন্ত ডিপার্টম্যান্টে যতবার ঝামেলা পেকেছে সব কয়বার শুরু হয়েছে শফিকের হাত ধরেই। কথা নেই বার্তা নেই হুট করে এসে পিঠে এক চাপড় বসিয়ে দেবে। তার সাথে কে ভালো সম্পর্ক রাখবে? আমার আবার ঠ্যাকা পরেছে। লাস্ট সেমিস্টারে লটারি করে গ্রুপ করা হয়েছে। ভালোই ছিলো। আমি, নোভা, দিবা আর জিহাদ এক গ্রুপেই পরেছি। সম্পূর্ণ কাকতালীয় ভাবেই ঘটেছে সবকিছু। কিন্তু মাঝখানে ফ্যাঁকড়া বাধলো। পঞ্চম সদস্য হিসাবে জায়গা করে নিয়েছে আমাদের পালোয়ান ভাই শফিক।

এইসব নিয়ে ভাবছি আর ওমনি ডাক্তার আপুর কল এলো, “হ্যালো আপু। কি খবর? হঠাৎ…” কথাটা শেষ করতে পারলাম না। ওমনি ঝাড়ি শুরু। “বেশি বড় হয়ে গেছিস তুই?” “আরে ছিঃ ছিঃ আপু। কি বলো তুমি। যত বড়ই হই থাকবো তো তোমার ছোটো ভাই হয়েই। হয়েছি কি? ক্ষেপে আছো কেনো?” “জ্বর কতটুকু এখন?” “না মানে আপু, সেরে গেছে তো।” “থাপ্পড় টা কি চ্যাম্বারে এসে খেয়ে যাবি নাকি আমি আসবো ক্যাম্পাসে?” “আরে আপু ছাড়োতো। তেমন কিছুই না। সামান্য একটু জ্বরের জন্য এতো প্যানিক করছো কেনো?” “শোন, বহুত প্যাচাল পাড়ার অভ্যাস হয়ে গেছে তোর। এতো কথা না বাড়িয়ে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করে মাম চত্বরে চলে আয়। আমি আসছি। আর বিশ মিনিট লাগবে আমার।” “আচ্ছা ঠিক আছে আপু। আসছি।” এর বেশি কিছু বলার সাহস ও আমার নেই। আর বললেও লাভ হবে না জানি। সানিয়া আপু এমনই। যখন যা বলবে সাথে সাথে না করলে কপালে শনি আছে। আর পাঁচটা সাধারণ ডাক্তারের মতো না সে। দেশের নামকরা নিউরো সার্জন সে। দেশের সুনামধন্য যতো ব্যাক্তিত্ব রা আছে তার কাছে ট্রিটম্যান্ট করানোর জন্য সিরিয়ালে থাকে। আর এই সানিয়া আপুই তার ভাই বোনগুলোর জন্য একজন সাধারণ মানুষ ছাড়া আর কিছুই না। আপুর সাথে আমার পরিচপয় নোভা, দিবার মাধ্যমে।

নোভা, দিবা আপন বোন। নাম শুনে হয়তো আন্দাজ করতে পেরেছেন। তবে মজার ব্যাপার হলো ওরা দুজন যমজ। হ্যাঁ! হুবহু দেখতে, কথার ধরণ, আচার আচরণ, কণ্ঠস্বর এবং হাইট ও। এ কি করে সম্ভব তা আমার আজও বোঝা হলো না। জীবনে যমজ কম দেখিনি। তবে এমন টা যে কখনোই দেখিনি তা একেবারে সত্য কথা। তো যা বলছিলাম। সেদিন ক্যাম্পাসে আমাদের নবীন বরণ অনুষ্ঠান। স্বাভাবিক ভাবেই মেয়েরা পরেছে শাড়ী আর ছেলেরা হয় পাঞ্জাবী নয় ফতুয়া। আমি এক বান্দা হাবার মতোন একটা ঢিলাঢাকা হাফ হাতা টি-শার্ট গায়ে চড়িয়ে বিন্দাস এসে প্রোগ্রামে হাজীর। অনুষ্ঠানে এতো এতো ছেলে মেয়ে, কিন্তু চিনি না একটা কাক পক্ষীকেও। ভীরভাট্টা ঠেলেঠুলে একদম পেছনের সাড়ির একটা চেয়ারে গিয়ে বসলাম। সবাই নাচানাচি করছে আর এদিকে সুমি আপা তার সুরেলা কণ্ঠে গান গেয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। চিরকুটের সুমি আপার কথাই বলছি। অন্য সময় হলে আমিও নাচতাম। নাচতে নাচতে হয়তো টি-শার্ট খুলে মাথার উপরে তুলে ঘুরাতাম। কিন্তু সেই মুহুর্তে এমনটা করার একদমই ইচ্ছে হচ্ছিলো না।

কিছুক্ষণ এভাবেই বসে থাকার পর লক্ষ করলাম, আমার পাশে সালোয়ার কামিজ ও চোখে মোটা গ্লাসের চশমা পড়া একটা আপু বসে আছে। গম্ভীর হয়ে আছে বলে কিছু বলতেও ভয় পাচ্ছিলাম। উনাকে দেখে বারবার কেনো যেনো মনে হচ্ছিলো কোনো একটা বিষয় নিয়ে খুবি বিরক্ত হয়ে আছেন। অনেক্ষণ ধরে আকুপাকু করছি দেখে আমার দিকে না তাকিয়ে আপুটাই জিজ্ঞেস করলো, “আমি দেখতে কি খুবই উদ্ভট?” এক সেকেন্ডের জন্য থতমত খেয়ে গেলাম। তারপরি নিজেকে সামলে নিয়ে এমন ভাবে উত্তর দিলাম যেনো উনি বুঝতে না পারে আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছি, “না তো। আপনার এমনটা কেনো মনে হলো?” “এতোক্ষন যাবৎ যেভাবে তাকিয়ে আছো মনে হচ্ছে ভূত দেখছো।” “আরে না না আপু, কি যে বলেন না। ভূত কেনো ভাববো?” “তাহলে এতোক্ষণ ধরে যেটা বলবে ভাবছো সেটা বলে ফেলো। আর আমি বিরক্ত হয়ে আছি আমার দুইটা বোনের উপর। দুটো বেধম নেচে যাচ্ছে। রাতে নির্ঘাত পায়ের ব্যাথায় কান্নাকাটি করবে।” আপুর কথায় আবারো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। সে বিরক্ত হয়ে আছে এমনটা আমি মনে মনে ভেবেছি। কিন্তু সে এটা জানলো কি করে? এটা তো সম্পূর্ণই আমার মনের ব্যাপার। আমি কি ভাববো বা না ভাববো সেটা তার একেবারেই জানার কথা না।

চলবে…..

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *