সাজ্জাদ হোসেন ক্ষুদ্রের উপন্যাস “ঘুণে খাওয়া পান্ডুলিপি”- ১ম পর্ব

জাহিদ ভাই এর সাথে দেখা হয়না আজকে দুই সপ্তাহ হলো। হলে গণ্ডগোল লাগার পর বেধম মার খেতে হয়েছে আমাদের সবার। জাহিদ ভাই হলের সিনিয়র হয়েও ছাড় পায়নি। মার তাকেও খেতে হয়েছে। রাজনৈতিক হলে থাকলে এমন মার খেতেই হয়। কিন্তু জাহিদ ভাইয়ের সাথে মোরশেদ ভাইয়ের ঝামেলা অন্য বিষয়ে। মোরশেদ ভাই হলের ভিপি। এক’ই সাথে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র নেতা। জাহিদ ভাই শুরু থেকেই মোরশেদ ভাইকে মানা করেছিলো রাজনীতিতে ইনভল্ভ হতে। কিন্তু কে শোনে কার কথা? রাজনীতির স্বাদ যার হলকে একবার লেগে যায় সে কি আর কারো কথা শোনে?

মোরশেদ ভাইকে সবাই এখন সম্মান করে। না, সে বড় ভাই এই জন্য না। এই জন্য যে তাকে সম্মান না দেখালে হলে থাকা আর নরকে থাকা এক সমান হয়ে যাবে। জাহিদ ভাই দুইশো ছাপ্পান্ন নম্বর রুমে থাকতো। আজকে সকালে সেই রুমে আমি শিফট করেছি। ভেবেছিলাম জাহিদ ভাইয়ের সাথে থাকলে হয়তো ভালো থাকতে পারবো। কিন্তু কিসের কি! জাহিদ ভাই গত দুই সপ্তাহ ধরে একেবারে উধাও হয়ে আছে। আমি হলে থেকে গেছি ঠেকায় পরে। ক্লাস এখনো বন্ধ হয়নি। হলে থাকলে অন্তত থাকার খরচ টা লাগে না। আর একবেলা খেয়ে বাকি সময় ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিচ্ছি।

মোরশেদ ভাইও জাহিদ ভাইয়ের মতোই আমাকে খুব আদর করে। তাদের মধ্যে ঝামেলা যেমনই থাকুক, আমাকে কখনো তারা একে অপরের বিরুদ্ধে উস্কানোর প্রয়াস করেনি। আমার ধারণা তারা মনে মনে এখনো বন্ধু রয়ে গেছে। খালি সিস্টেমের ফেরে পরে ঝামেলায় লেগে আছে। আমার কথা হলো, যেই সিস্টেমের কারণে দুই বন্ধুর জীবন অতিষ্ট হয়ে গেছে সেই সিস্টেমে থাকার প্রয়োজন টাই বা কি? যতো দোষ সব ক্ষমতার। রাজনীতির দোষ দিয়ে লাভ কি? রাজনীতি তো কাউকে বলে যায়নি একে অন্যের ক্ষতি করো। একে ধরো, তাকে মারো।

‘সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হলে সক্রিয় রাজনীতি করবো,’ এমন শখ আমার কলেজে থাকা সময়কাল থেকেই। তখনকার ছাইপাঁশ রাজনীতি কখনোই আমার মনে ধরেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বরাবরের মতো এখনো আমাকে টানে। তবে সাহসে কুলোয় না। তাই আর পাঁচটা সাধারণ ছাত্রের মতো আমিও বিনা কোনো ক্ষমতার আদলে এই ক্যাম্পাসে বিচরণ করছি। স্বপ্ন দেখা বহু আগে ছেড়ে দিয়েছি। শখ গুলোকেও এক এক করে বিদায় দিয়ে দিচ্ছি।

গত তিনদিন ধরে ভালোই জ্বর এসেছে। মার খেয়ে তেমন একটা কষ্ট হয়নি। কিন্তু যেই না ব্যথা কমলো, ওমনি শত ডিগ্রী জ্বর এসে বাসা বাধলো গায়ে। ক্যাম্পাস মেডিকেলের ডিস্পেন্সারি থেকে ঔষধ এনে খাচ্ছি। কমার কোনো নাম গন্ধ নেই। পকেট একদমই ফাঁকা। ভালো কোনো হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার দেখাবো সেই সাহস ও হচ্ছে না। মাসের আজকে পাঁচ তারিখ পেরিয়ে গেলো, এখনো দুইটার একটাও টিউশনের বেতন পেলাম না। পল্লবের টা এক দুদিনে পেয়ে যাবো জানি। শুরুর সময় ই ভদ্রমহিলা, পল্লবের মা বলেছিলো, “বাবা, দশ তারিখের আগে তোমার আঙ্কেলের বেতন হয় না। তাই তোমার বেতন দশের আগে দেওয়া আমার পক্ষে এক প্রকার অসম্ভব। তবে আমি চেষ্টা করবো যেনো দেরি না হয়।” গতো সাত মাস ধরে পড়াচ্ছি পল্লব কে। প্রতিবারই বেতন সাত আট তারিখের মধ্যে পেয়ে গেছি। আন্টি হাসি মুখে এনে হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেছে। আর অন্যদিকে অনিক। আজ পর্যন্ত কোনোবারই মাসের পনেরো তারিখের আগে বেতন পাইনি। লজ্জায় কিছু বলতেও পারি না। পাছে আবার টিউশনিটাই না ছুটে যায়।

হলে শুয়ে শুয়ে পিঠ ঘাড় ব্যাথা হয়ে গেছে। জ্বরের জন্য উঠে যে বাইরে থেকে ঘুরে আসবো সেই সাহস টাও হচ্ছে না। যদিও আজকে জ্বর অনেকটাই কম। ডিস্পেন্সারির সস্তা ঔষধ তার পরিশোধনের কাজ শুরু করে দিয়েছে। আজকে সন্ধ্যায় একবার পল্লবদের বাড়িতে যেতে হবে। এভাবে টিউশন মিস দেয়া মোটেও ঠিক হচ্ছে না। গত দুদিন পড়াতে পারিনি। সামনে পল্লবের বোর্ড পরীক্ষা। এখন কোনো প্রকার অবহেলা করা যাবে না। কারণ এই টিউশনি আমার বর্তমান রোজগারের জায়গা। এটা না থাকলে রীতিমতো না খেয়ে মরা ছাড়া আর কোনো উপায় আমার থাকবে না।

দুইশো ছাপ্পান্ন নাম্বার রুমে আমরা তিনজন থাকি। আমি, ফারুক আর জাহিদ ভাই। ফারুক গত বছর থেকেই আছে এখানে। আমি আজকেই উঠলাম এইরুমে। আমার আগে নিলয় ভাই থাকতো এখানে। জাহিদ ভাইয়ের ও সিনিয়র। গত মাসে তার পোস্ট গ্রেজুয়েশন শেষ হয়েছে তাই আর হলে থাকার প্রয়োজন নেই। বড় মার্কেটের দিকে বাসা নিয়েছে। আমি চেয়েছিলাম তখনি উঠতে। কিন্তু হলে শুরু হলো ঝামেলা। জাহিদ ভাই গায়েব হয়ে গেলো। শেষমেস না পেরে জ্বর নিয়েই এই রুমে এসে উঠেছি।

চলবে…………

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published.