হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে বাড়িতে ফিরে গেলেন সেই রিনা বেগম

গত সোমবার রাত থেকে গতকাল মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করেও যশোর জেনারেল হাসপাতালের ওয়ার্ডে জায়গা পাননি রিনা বেগম। ওয়ার্ড খালি না থাকায় বাইরে খোলা আকাশের নিচেই তাঁকে শুইয়ে রাখা হয়েছিল। অবেশেষে স্বজনেরা তাঁকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে গেছেন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, চিকিৎসায় কোনো অবেহেলা করা হয়নি। বরং করোনায় আক্রান্ত জেনে ভয়ে হাসপাতাল থেকে রিনা পালিয়ে গেছেন।

শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে গত সোমবার রাত সাড়ে ১০টায় হাসপাতালে আসেন ষাটোর্ধ্ব রিনা বেগম। করোনা সন্দেহে জরুরি বিভাগ থেকে তাঁকে আইসোলেশন (ইয়েলো জোন) ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। কিন্তু ওই ওয়ার্ডে কোনো জায়গা না থাকায় বাইরে খোলা আকাশের নিচেই অক্সিজেন দিয়ে তাঁকে শুইয়ে রাখা হয়।

আজ বুধবার বেলা একটার দিকে হাসপাতালে গিয়ে রিনা বেগমকে পাওয়া যায়নি। রিনা বেগমের বিষয়ে আইসোলেশন ওয়ার্ডের অন্যান্য রোগীর স্বজনেরা জানান, গতকাল বিকেলেই রিনা বেগমের দুই ছেলেমেয়ে এসে তাঁকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে গেছেন।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য রিনা বেগমের ভর্তি ফরমে দেওয়া মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। এর আগে গতকাল দুপুরে রিনার স্বামী আবদুল আজিজ প্রথম আলোকে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সোমবার রাত পৌনে ১১টার থেকে রোগী নিয়ে ওয়ার্ডের বাইরে বসে আছি। নার্সদের সঙ্গে কথাই বলা যাচ্ছে না। শুধু অক্সিজেন দিয়েই তাঁরা দায়িত্ব শেষ করেছেন। কোনো চিকিৎসা-ওষুধপত্র নেই। সকালে একজন চিকিৎসক এসে শুধু অক্সিজেন বাড়িয়ে দিয়ে গেছেন। হাসপাতালে এমনিতেই কোনো চিকিৎসা নেই। আমরা রোগীকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাব বলে ভাবছি।

অভিযোগ অস্বীকার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আখতারুজ্জামান বলেন, ‘হাসপাতালে রিনা বেগমের চিকিৎসায় কোনো অবহেলা করা হয়নি। শ্বাসকষ্ট থাকায় ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে অক্সিজেন দেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। আইসোলেশন ওয়ার্ডে জায়গা না থাকায় তাৎক্ষণিকভবে তাঁকে ওয়ার্ডের ভেতরে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে পরীক্ষায় তাঁর করোনা শনাক্ত হয়। এরপর তাঁকে রেড জোনে নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছিল। কিন্তু এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কিছু না জানিয়েই রোগী পালিয়ে গেছেন।’

হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডের ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স হোসনে আরা খাতুন বলেন, গতকাল আইসোলেশন ওয়ার্ডে পা রাখার জায়গা পর্যন্ত ছিল না। রিনা বেগমের মতো তিনজন রোগী ওয়ার্ডের বাইরে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছিলেন। এই ওয়ার্ডে ভর্তি ১০ করোনা রোগীকে রেড জোনে স্থানান্তরের কাজ চলছিল। ওই ১০ জন বেরিয়ে গেলে জায়গা খালি হয়। তখন বাইরে থাকা রোগীদের ভেতরে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর মধ্যে বিকেলের পর থেকে রিনা বেগমকে আর হাসপাতালে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

যশোরের একমাত্র করোনা ডেডিকেটেড যশোর জেনারেল হাসপাতালে শয্যাসংকটের কারণে রিনা বেগমের মতো অনেকেই ভোগান্তিতে পড়ছেন। গতকাল ১৯ শয্যার ইয়েলো জোনে রোগী ভর্তি ছিলেন ৯৯ জন। শয্যা খালি না থাকায় হাসপাতালের মেঝেতেও রোগীদের শুইয়ে রাখা হচ্ছে। গতকাল ওয়ার্ডের বারান্দায় সারি সারি বিছানা ফেলে অন্তত ৩০ জন রোগী ছিলেন। এ পরিস্থিতিতে গতকাল রাতে হাসপাতালের টিকাদানকেন্দ্রে ২৪টি শয্যা বসিয়ে আরেকটি আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হয়। এতে হাসপাতালের ইয়েলো জোনে কিছুটা স্বস্তি ফেরে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালের রেড ও ইয়েলো জোনে করোনায় আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রেড জোনে ছয় ও ইয়েলো জোনে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে রেড ও ইয়েলো—দুই জোন মিলিয়ে মোট ২৪৩ জন রোগী ভর্তি আছেন।

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *